জানাজার নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম

আজ আমি জানাজার নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম নিয়ে আলোচনা করব। আমরা অনেকেই আছি জানাজার নামাজ পড়ার পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত নই।

কোন মরে যাওয়া লোককে কবর দেওয়ার আগে ইমামের নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়ে যে নামাজ পড়া হয়, তাকে জানাজার নামাজ বলে।

জানাজা মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা ইসলামী শরীয়তে ফরজে কেফায়া হিসেবে মুসলমানদের উপর অর্পিত হয়েছে।

আর ইসলাম ধর্মের লোকদের জন্য একটি আবশ্যকীয় কর্তব্য।

যে কোন গোত্র বা দল থেকে একজন জানাজার নামাজ আদায় করলে তা সবার পক্ষ থেকে পালন হয়ে যায়।

এই নামাজ মুসলমানদের সাওয়াব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি ব্যক্তির জন্য জান্নাতে যাওয়ার সুপারিশ হিসেবে গণ্য হয়।

জানাজার নামাজে বেশি লোক হলে তা মোস্তাহাব হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই নামাজে মুসল্লিদের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি হবে ,ততই উত্তম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কাতারের সংখ্যা বেজোড় হওয়া ভালো।

বিশেষ করে জানাজার নামাজ মৃত ব্যক্তির জন্য প্রার্থনা ইস্তেগফার করা হয়। জানাজার নামাজ পড়ার পদ্ধতি নিচে দেওয়া হল। 

আরো পড়ুনঃইসলামের দৃষ্টিতে পর্দার হুকুম ও নারীর মর্যাদা

জানাজার নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম

আমরা সবাই জানি জানাজা চার তাকবীরের নামাজ।

এই নামাজে রুকু এবং সেজদার প্রয়োজন হয় না। আমরা তা দাঁড়িয়ে আদায় করে থাকি।

আর এই নামায সমাপ্ত হয় সালাম ফেরানোর মধ্যে দিয়ে।

মূলত এই নামায সমাপ্ত হওয়ার পর মুনাজাত অথবা দোয়ার প্রয়োজন হয় না।

কারণ আমরা জানি ইসলামী শরীয়তে এই নামাজের মাধ্যমে একজন মৃত লোকের জন্য প্রার্থনা করা হয়।

জানাজা সমাপ্ত হওয়ার পরে একজন মৃত লোককে তাড়াতাড়ি কবরস্থানে নিয়ে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক মাটিতে কবর দেওয়া হয়।

আসুন জেনে নেই জানাজার নামাজ পড়ার সহীহ নিয়মঃ

জানাযার নামাজের আরবি নিয়ত

জানাযা নামাযের শুরুতে নিয়ত বাঁধতে হবে। এই নিয়ত সরাসরি মুখে বলার প্রয়োজন হয় না। নিয়ত বাধার পর তাকবীর দিয়ে নামাজ আরম্ভ করতে হবে এবং হাত বুকে বাধতে হবে। এই আরবি নিয়তটি হলো-

نويت أن أؤذى يله تعا لي أربع تكبيرات صلوة الجنازة فرض الكفاية والثنا ء يله تعا لي والصلوة على النّبي والدعاء لهذا التيت إقتديت بهذالإمام متوجها إلى جهة الكعبة الشر يفة الله اكبر

বাংলা উচ্চারণঃ নাওয়াইতুয়ান উয়াদ্দিয়া লিল্লাহি তা’আলা আরবায়া তাকবীরাতে সালাতিল জানাযাতি ফারধুল কেফায়াতি ওয়াছ ছানায়ু লিল্লাহি তা’য়ালা ওয়াছ সালাতু আলান নাবিয়্যি ওয়াদ্দোয়ায়ু লিহাযাল মাইয়্যেতি এক্বতেদাইতু বিহাযাল ইমামি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’য়বাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার।

এই নিয়তের অনুবাদ হলো আমি আমার রবের জন্য জানাজার নামাজের চার তাকবীর ফরজে কেফায়া এবং কেবলামুখী হয়ে ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইহা প্রভুর গুনোগান।

এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরুদ  এবং মৃত লোকের জন্য প্রার্থনা বা দোয়া।

তবে একটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, অন্যান্য সকল নামাজের নিয়তের মত ইমাম অতিরিক্ত ভাবেই এই শব্দটি অর্থাৎ “আনা ইমামুল লিমান হাধারা ওয়া মাইয়্যাহজুরু” বলবে।

আর মুক্তাদীগণ একতেদাইতু বিহাযাল ইমাম এই শব্দটি বলবে। একটি জিনিস মাথায় রাখবে নিয়তের ক্ষেত্রে যদি মৃত ব্যক্তি পুরুষ হয়, তাহলে লিহাযাল মাইয়্যিতি  বলতে হবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি মহিলা হয়, তাহলে লিহাযিল মাইয়্যিতি  বলতে হবে।

আরো পড়ুনঃ তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল

জানাযার নামাজের বাংলা নিয়ত

আমাদের মধ্যে অনেক ভাই আছে যারা আরবীতে নিয়ত করতে পারে না।

অর্থাৎ আরবিতে নিয়ত করা কঠিন মনে হয়। আজ তাদের জন্য এই প্যারাতে জানাজার নামাজের বাংলা নিয়ত কিভাবে করব তা নিয়ে আলোচনা করব ইনশাল্লাহ।

এই নিয়তটি হলো-আমাদের মধ্যে অনেক দ্বীনি ভাই আছে যারা গুগলের সার্চ করে থাকে “জানাজার নামাজের বাংলা নিয়ত“।

আসলে প্রকৃতপক্ষে নিয়ত শব্দের অর্থ হলো ইচ্ছা পোষণ করা অথবা অন্তর থেকে কোন কিছু চাওয়া।

এর জন্য আপনাকে নিয়ত করতে হবে তা কিন্তু নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম উনার সাহাবীগণ কখনো নিয়ত পড়েন নি।

তারা নিয়ত করেছেন। যেমন ধরে নিন আপনি এ বছর হজ করবেন।

এর নিয়ত করতে পারেন। তাই সর্বোপরি আপনি যখন জানাজার নামাজ পড়তে যাবেন, তখন আপনি ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে তার সাথে তাকবীর বলে দিলেই আপনার নিয়ত হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

দ্বিতীয়তঃ নিয়তের পর ছানা পাঠ করতে হবেঃ

প্রথম তাকবীর সম্পন্ন করার পর এই ছানাটি পাঠ করতে হবে। এই ছানা হল-

سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك وجل ثناءك ولا اله غيرك

বাংলা উচ্চারণঃ সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারা কাসমুকা ওয়া তায়ালা জাদ্দুকা ওয়াজাল্লাছানাউকা ওয়ালা ইলাহা গাইরুকা।

এর বাংলা অনুবাদ হল হে প্রভু আমরা তোমার প্রশংসা করছি।

তোমার নাম কল্যাণময় এবং তোমার ওস্তি অতি উত্তম। তুমি ছাড়া আর কেউ মাবুদ নেই। 

তৃতীয়ত দুরুদ শরীফ পাঠ করতে হবেঃ

দ্বিতীয় তাকবীর সম্পন্ন করার পর এই দুরুদ শরীফ পাঠ করবেন। এই দুরুদ শরীফটি হলো-

-اللهم صل على محمد وعلى آل محمد كما صليت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنك حميد مجيد – اللهم بارك على محمد وعلى آل محمد كما باركت علىحمید مجید

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মোহাম্মদ।

ওয়ালা আলি মোহাম্মদ। কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীম। ওয়ালা আলী ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মোহাম্মদ।

ওয়ালা আলি মোহাম্মদ।  কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীম।  ওয়ালা আলী ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।

এর অনুবাদ হল হে প্রভু রাসুল সাঃ এবং তাহার বংশধর দের সেইরুপ অনুগ্রহ প্রদান কর।

যেভাবে ইব্রাহিম এবং তার বংশধরদের উপর অনুগ্রহ প্রদান করিয়াছেন।

নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয়এবং মহা মহিয়ান। এখন  দুই নং দরুদ এর অর্থ বলবো। আর তা ঠিক পূর্বের অর্থ মতই। 

আরো পড়ুনঃ তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল

এখন জানাযার দোয়া পড়তে হবেঃ

একটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে, যদি মৃত লোকটি বালেক অথবা প্রাপ্তবয়স্ক , পুরুষ বা নারী যাই হোক না কেন তৃতীয় তাকবীর সম্পন্ন করার পর নিচের প্রথম দোয়াটি পাঠ করবেন।

তবে মৃত লোকটি যদি নাবালক অথবা অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ছেলে হয়, তাহলে নিচের দ্বিতীয় দোয়াটি পাঠ করবেন। আর নাবালেগ মেয়ে হলে তৃতীয় দোয়াটি পাঠ করবেন। 

প্রথম দোয়াটিঃ

-اللهم اغفر لحينا وميتنا وشاهدنا وغائبنا وصغيرنا وكبيرنا وذكرنا وأنثانا اللهم من أحييته منا فأخيه على الإسلام ومن توفيته منا فتوفه على الإيمان برحمتك يا أرح الراحمين

আল্লাহুম্মাগফিরলী হাইয়্যিনা ও মাইয়্যিতিনা ওয়াজ শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া ছাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা।

আল্লাহুম্মা মান আহ ইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইমান। ওয়া মান তাওয়াফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফাহু আলাল ইমান। বিরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহিমিন।

এর অনুবাদ হল হে প্রভু আমাদের মধ্যে যারা বেঁচে আছে এবং যারা মরে গেছে, বালক এবং বৃদ্ধ লোক এবং রমণীদের ক্ষমা করো।

হে প্রভু আমাদের মধ্যে যাদেরকে তুমি বাঁচিয়ে রাখ, তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করো। তাহাদের কি ঈমানের সহিত মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দিও।

দ্বিতীয় দোয়াটিঃ

اللهم اجعله لنافرقا وجعله لنا اجرا وذخرا وجعله لنا شا فعا ومشفعا

আললাহুম্মাজ আলহু লানা ফারতাও ওয়াজ আলহু লানা আজরাও ওয়া যুখরাও। ওয়াজ আলহু লানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ ফায়ান।

এর অনুবাদ হল হে প্রভু উহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী করে দাও। এবং পুরস্কার ও সমর্থনের প্রধান লক্ষ্য করো

উহাকে আমাদের জন্য সমর্থনকারী এবং এমন সমর্থনকারী বানাও যা গ্রহণযোগ্য। 

তৃতীয় দোয়াটিঃ

-اللهم اجعلها لنا فرطا واجعلها لنا آجا ،ذجا الجعلها شافعة ومسقعة

আললাহুম্মাজ আলহা লানা ফারতাও ওয়াজ আলহু লানা আজরাও ওয়া যুখরাও।  ওয়াজ আলহা লানা শাফিতাও ওয়া মুশাফফায়ান।

এর অনুবাদ হলো হে প্রভু ইহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী করে দাও। এবং ইহাকে আমাদের জন্য  পুরস্কার ও সমর্থনের প্রধান লক্ষ্য করো।

ইহাকে আমাদের জন্য সমর্থনকারী এবং এমন সমর্থনকারী বানাও যা গ্রহণযোগ্য।

পরিশেষে, ইমাম চতুর্থ তাকবীর এর মাধ্যমে ডান এবং বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ সম্পূর্ণ করবে।

আশা করি জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম বা জানাজার নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম জানতে পেরেছেন। 

আরো পড়ুনঃ বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম জেনে নিন

জানাজার নামাজের ফজিলত জেনে নিন

আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি জানাজার নামাজ পড়া ফরজে কেফায়া তাই আমাদের গোত্র অথবা সমাজ থেকে যদি কেউ একজন জানাজা নামাজ আদায় করে।

তাহলে সবার পক্ষ থেকে পালন হয়ে যাবে। তবে যদি কোন ব্যক্তি আদায় না করে তাহলে সম্পূর্ণ গোত্র দায়ী হবে।

যদি কেউ বিপদগ্রস্ত হয় অথবা কোনো সমস্যায় পড়ে আসতে না পারে, তাহলে যে কেউই পালন করলে আর গোনাহগার হবে না।

হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পালন করবে, তাহলে সে উহুদ পরিমাণ সাওয়াব পাবে।

তাই আপনাদের মধ্যে কেউ যদি সুযোগ পান, তাহলে এই নামাজ অবশ্যই আদায় করার চেষ্টা করবেন।

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের জানাজার নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম জানা উচিত এবং আদায় করা উচিত।

আর যদি আমরা আমাদের দল থেকে কেউ পালন না করি, তাহলে এর জন্য আমাদের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। নতুন তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইট Foodtips24 এ যুক্ত থাকুন। এবং আমাদের ফেসবুক পেইজের সাথে যুক্ত থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.